বিয়ের কেনাকাটা মানেই কি শুধু টাকা খরচ আর মাথা ঘোরানো লিস্ট? জেনে নিন কীভাবে সহজ করবেন পুরো ব্যাপারটা
বিয়ে ঠিক হওয়ার পর প্রথম যে বাক্যটা মাথায় ঘোরে সেটা হলো— “এখন তো তাহলে কেনাকাটা শুরু করতে হবে!”
আর তারপরই শুরু হয় আসল যুদ্ধ। শাড়ি, গয়না, ওড়না, বরের শেরওয়ানি, গায়েহলুদের ডালা, আত্মীয়স্বজনের জন্য উপহার— একটার পর একটা লিস্ট লম্বা হতেই থাকে। একবার বাজারে গেলে মনে হয় সব কিনে ফেলা দরকার, বাসায় ফিরলে মনে পড়ে অর্ধেক জিনিসই বাদ পড়ে গেছে।
সত্যি বলতে, বিয়ের কেনাকাটা যতটা না কঠিন, তার চেয়ে বেশি কঠিন হলো গুছিয়ে করাটা। তাই আজকের লেখায় বিয়ের কেনাকাটার আদ্যোপান্ত নিয়ে কথা বলা যাক— কনের শাড়ি থেকে শুরু করে বরের পোশাক, ওড়নার নতুন ট্রেন্ড, আর পুরো শপিং লিস্ট।
কনের শাড়ি: রঙে-ঢঙে যত বৈচিত্র্য
বিয়ের কেনাকাটায় সবচেয়ে বেশি সময় আর মন খরচ হয় শাড়ি খুঁজতে। কারণ একটা নয়, লাগে অনেকগুলো— গায়েহলুদ, মেহেদি, মূল অনুষ্ঠান, বৌভাত, রিসেপশন— প্রতিটির জন্য আলাদা শাড়ি চাই।
চলুন দেখে নিই বাজারে প্রচলিত কিছু জনপ্রিয় বিয়ের শাড়ি আর তাদের মোটামুটি দামের ধারণা—
- জামদানি: বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্যের শাড়ি। হাফ সিল্ক ও ফুল কটন দুই ধরনেই পাওয়া যায়, দাম শুরু হয় প্রায় ৫০০ টাকা থেকে, আর নকশা ও সুতার কাজ ভেদে ২০ হাজার টাকা পর্যন্তও উঠতে পারে।
- বেনারসি: বিয়েতে সবচেয়ে বেশি পরা শাড়িগুলোর একটি। কপার-গোল্ডেন সুতার কাজ, পাথর বসানো নকশা থাকে। সাধারণ বেনারসি সাড়ে তিন হাজার থেকে ত্রিশ হাজার টাকার মধ্যে মেলে, স্টোনের কাজ থাকলে দাম আশি-নব্বই হাজার টাকা পর্যন্তও ছুঁতে পারে।
- কাঞ্জিভরম: গিনি গোল্ড বা কপার সুতার কাজে তৈরি মসৃণ টেক্সচারের শাড়ি, দাম মোটামুটি আড়াই হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকার মধ্যে।
- কাতান: অনেক রকমের কাতান পাওয়া যায়— জর্জেট, মিরপুরীয়, তসর, মসলিন কাতান ইত্যাদি। দাম সাধারণত দেড় হাজার থেকে বিশ হাজার টাকার মধ্যে।
- পাকিস্তানি বারিশ: শিফনের ওপর সুতার কাজ করা হালকা ও মসৃণ শাড়ি, দাম পড়ে সাধারণত ২৭০০ থেকে ৫০০০ টাকার মধ্যে।
- সফট সিল্ক: দেশি সুতায় তৈরি, ম্যাট ফিনিশিংয়ের গর্জিয়াস শাড়ি, দাম মোটামুটি পনেরো থেকে বিশ হাজার টাকা।
- মসলিন: হালকা ও সাশ্রয়ী, দাম সাধারণত সাড়ে তিন থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে। ব্যাগে ভরে বেড়ানোর জন্যও দারুণ উপযোগী।
এসব ছাড়াও টাঙ্গাইল, বালুচরি, জামদানি-মসলিন মিশ্রণসহ আরও অনেক ধরনের শাড়ি বাজারে পাওয়া যায়। শাড়ি কেনার সময় দরদাম করা, পেটিকোট-ব্লাউজসহ পুরো সেট মিলিয়ে কেনা, আর দোকানে দিনের একেবারে শুরুতে গিয়ে “বউনি” করার চেষ্টা করাটাও অনেকের কাছে শুভ বলে ধরা হয়।
বরের পোশাক: শুধু শেরওয়ানি নয়, এখন চলছে নানা ধরন
আগে বিয়ে মানেই বরের পোশাক ছিল একরকম— একটা শেরওয়ানি, তার সঙ্গে পাগড়ি। এখন সেই ধারণা বদলেছে অনেকটাই। দিনের অনুষ্ঠান, সন্ধ্যার রিসেপশন, আবার বৌভাত— প্রতিটিতে বরেরা এখন আলাদা লুকে সাজছেন।
- দিনের অনুষ্ঠানের জন্য হালকা রঙের এমব্রয়ডারি করা পাঞ্জাবি বা জ্যাকেট স্টাইলের কোটি বেশ জনপ্রিয়।
- অনেকে আবার একই রঙের সেট বেছে নেন— যেমন সেজ গ্রিন পাঞ্জাবির সঙ্গে একই রঙের ফিটেড পায়জামা। লেয়ারিং করলেও রঙ এক হওয়ায় বাড়াবাড়ি মনে হয় না।
- কালো রঙের শেরওয়ানিও এখন অনেকে বেছে নিচ্ছেন, সঙ্গে সূক্ষ্ম সুতার নকশা।
- কনের শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে ক্লাসিক একরঙা শেরওয়ানি পরার চলও আছে— কনে লাল পরলে বর তার সঙ্গে মানানসই রং বেছে নেন।
- রিসেপশন বা সন্ধ্যাকালীন অনুষ্ঠানের জন্য সাদা শার্টের ওপর নেভি ব্লু স্যুট বা ব্লেজারও এখন বেশ চলছে।
মূল কথা হলো, বরের পোশাকেও এখন দিনের সময় আর অনুষ্ঠানের ধরন বুঝে সাজপোশাক ঠিক করার প্রবণতা বেড়েছে।
ওড়নার ট্রেন্ড: ছোট একটা জিনিস, কিন্তু বদলে দেয় পুরো লুক
শাড়ি বা লেহেঙ্গা যতই সুন্দর হোক, ওড়না ছাড়া কনের সাজ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বিয়ের ওড়নাতেও এখন বেশ কিছু নতুন ধারা চোখে পড়ছে—
- লম্বা ওড়না: আগে যেখানে আড়াই গজের ওড়না চলত, এখন অনেকে বেছে নিচ্ছেন এগারো-বারো গজ পর্যন্ত লম্বা ওড়না, অনেকটা বিদেশি বিয়ের ভেইলের ধাঁচে।
- একাধিক শেড: শাড়ি বা লেহেঙ্গার সঙ্গে মিলিয়ে একই রঙের দুই-তিনটি শেড অথবা একেবারে ভিন্ন রঙের মিশেল দিয়ে ওড়না বানানো হচ্ছে।
- দুই ওড়না একসঙ্গে: একটি মাথায়, আরেকটি হাতে বা কাঁধে রেখে জমকালো লুক তৈরি করছেন অনেক কনে।
- উপকরণ ও নকশা: মসলিন আর নেট কাপড়ের ওড়নাই এখনো জনপ্রিয়, সঙ্গে জামদানি-বেনারসির ওড়নাও চলছে। বিডস, ট্যাসেল, জারদৌসির কাজ করা চিকন পাড়ের ওড়নাই আপাতত ট্রেন্ডে এগিয়ে।
- রং: লাল রঙের চাহিদা এখনো সবচেয়ে বেশি, তার পাশাপাশি মেরুন আর সোনালি রংও বেশ চলছে।
যাঁরা বাজারে যা পাওয়া যায় তা না কিনে নিজের মতো করে বানাতে চান, তাঁদের জন্য পরামর্শ হলো হাতে অন্তত এক মাস সময় নিয়ে ফরমাশ দেওয়া— কারণ বিয়ের মৌসুমে কারিগরেরা এমনিতেই বেশ ব্যস্ত থাকেন।
গায়েহলুদের তত্ত্ব: ছোট আয়োজন, কিন্তু ভীষণ মজার
বিয়ের সবচেয়ে রঙিন অনুষ্ঠান বোধহয় গায়েহলুদ। এই অনুষ্ঠানের তত্ত্বে সাধারণত থাকে ডালা-কুলা, হলুদ রঙের পোশাক, প্রদীপবাটি, রাখি, চন্দন, হলুদ তোয়ালে, মেহেদি, ছোট পালকি, ঝুড়ি, মিষ্টি আর কনে-বরের জন্য কসমেটিকস। চাইলে এই জিনিসগুলো আলাদা করে কিনে নিজেই ডালা সাজানো যায়, আবার বাজারে রেডিমেড সাজানো ডালাও পাওয়া যায়। আজকাল প্রাকৃতিক ফুলের পাশাপাশি কৃত্রিম ফুল দিয়েও অনেকে স্টেজ আর তত্ত্ব সাজাচ্ছেন, খরচ আর ঝামেলা— দুটোই কম হয় তাতে।
পুরো একটা চেকলিস্ট থাকলে ঝামেলা কমে অনেকটাই
বিয়ের কেনাকাটায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তাড়াহুড়োয় অনেক কিছু বাদ পড়ে যায়। তাই একটা গোছানো তালিকা হাতে থাকলে শেষ মুহূর্তের দৌড়াদৌড়ি অনেকটাই কমে।
কনের জন্য মূলত যা যা লাগে: শাড়ি (কয়েক সেট, ভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য), ব্লাউজ-পেটিকোট, সালোয়ার-কামিজ, নাইট গাউন, গয়না, মেকআপ ও স্কিন কেয়ার সামগ্রী (ফাউন্ডেশন, লিপস্টিক, কাজল, মাসকারা ইত্যাদি), চুলের যত্নের জিনিস, পারফিউম-বডি স্প্রে, স্যান্ডেল-জুতা, ভ্যানিটি ব্যাগ, আর প্রয়োজন হলে ধর্মীয় সামগ্রী যেমন জায়নামাজ, তসবিহ।
বরের জন্য মূলত যা যা লাগে: শেরওয়ানি বা পাঞ্জাবি, পাগড়ি, পাজামা, স্যান্ডেল-জুতা, ব্লেজার-স্যুট, শার্ট-প্যান্ট, বেল্ট, পারফিউম, ঘড়ি, শেভিং সেট, আর বিয়ের রিং।
এই তালিকার বাইরেও প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব রীতি অনুযায়ী কমবেশি জিনিস যোগ হতে পারে— যেমন আত্মীয়স্বজনের জন্য উপহার, বা গ্রামের বিয়েতে বাড়তি কিছু আচার-অনুষঙ্গ।
শেষ কথা: পরিকল্পনাই আসল চাবিকাঠি
বিয়ের কেনাকাটা আনন্দের হলেও অগোছালো হলে সেটাই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই কাজটা সহজ করতে কয়েকটা ছোট অভ্যাস কাজে দিতে পারে—
- আগে থেকে একটা মোটামুটি বাজেট ঠিক করে নেওয়া
- কনে-বর দুজনের জিনিস আলাদা তালিকায় রাখা
- প্রতিটি কেনাকাটার রসিদ বা দাম টুকে রাখা, যাতে বাজেটের হিসাব হাতের বাইরে না যায়
- অনলাইনে দাম-ডিজাইন যাচাই করে তারপর দোকানে যাওয়া, এতে সময় আর দরদামের ঝামেলা দুটোই কমে
বিয়ে জীবনের একটা নতুন অধ্যায়ের শুরু। কেনাকাটার হিসাব-নিকাশ যতই থাকুক, আসল কথা হলো দিনটা যেন সুন্দর আর স্মরণীয় হয়ে থাকে।

